চেঙ্গী কেন চিংড়ী হবে!

প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২১

বর্তমানে নদীর পানি, ছড়ার পানি শুধু দূষিত হচ্ছে না- ছড়া, নদীর নামগুলোকেও ‘দূষিত’ করার কাজ শুরু হয়েছে। ছেলেবেলায় যে ছড়াকে যে নামে চিনতাম, সে নামগুলোকে নানাভাবে বিকৃত করা হচ্ছে। যে নদীকে যে নামে চিনতাম, জানতাম, সে নামগুলোকেও বিকৃত করানো হচ্ছে। নদীর পানি, পরিবেশ দূষণ শেষে এখন নদীর নামগুলোকে ‘দূষণ’ করা হচ্ছে। মাহবুব সিদ্দিকীর বইয়ে সপ্তম অধ্যায়ে (পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চল) লিখেছেন, ‘চিংড়ী নদী কর্ণফুলীর অপর একটি প্রধান উপনদী। চিংড়ী খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলাধীন চেঙ্গী ইউনিয়ন পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপত্তি। …চিংড়ী নদীর দৈর্ঘ্য ৯৬ কিলোমিটার’ (মাহবুব সিদ্দিকী- আমাদের নদ-নদী, আগামী প্রকাশনী, ২০১৫ পৃষ্ঠা-১৫২)। আমরা যে নদীকে চিনি, জানি, এতদিন বইয়েও পড়ে এসেছি সেই চেঙ্গীকে গবেষক সিদ্দিকী নাম দিয়েছেন চিংড়ী। শুধু মাহবুব সিদ্দিকী নন, মোহা. আবদুল হক সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মানচিত্রে কেমন আমার বাংলাদেশ’ বইয়ে বাংলাদেশে নদীপথ চিত্রে চেঙ্গী নদীকে চিংড়ী নামে চিহ্নিত করা হয়েছে (পৃষ্ঠা-৪)। এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে আর দ্বাদশ সংস্করণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১৮ সালে। বইটির জনপ্রিয়তা দেখে আমায় ভয় জাগে। হাজার হাজার পাঠক আমাদের চিরচেনা নদীর নামকে চিনতে শুরু করবে চিংড়ী নদী নামে এবং আগামীতে এ নামেই পরিচিতি ও লেখালেখি বাড়বে।

ইতোমধ্যে পরিচিত লেখকগণও আমাদের নদীকে চিংড়ী বা চিংড়ি নামে লিখতে শুরু করেছেন- যেমন ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের লেখা ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন’ শিরোনামে পাহাড়ে নদ-নদীর নামগুলো লিখেছেন ‘মাতামুহুরী, কর্ণফুলী, রাংখিয়াং, সাংগু, মায়ানী, চিংড়ি, ফেনী ও বাগখালী নদী…’ (নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা সম্পাদিত, চরণরেখা তব বঙ্গবন্ধু ও পার্বত্য চট্টগ্রাম, পৃষ্ঠা ১৯৪)।

একইভাবে মাহবুব সিদ্দিকী লিখেছেন- ‘রাংখাইন কর্ণফুলীর অন্যতম প্রধান উপ-নদী। রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলাধীন ফারুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ দিকের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে রাংখাইন। রাংখাইন স্থানীয়ভাবে রাইক্ষং নামে পরিচিত’ (পৃষ্ঠা: ১৫২-১৫৩)।

চেঙ্গী নদীকে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা ডাকে ‘সিয়াই’। মারমা ভাষাভাষিরা ‘চইংগী’ আর চাকমা ভাষাভাষিরা ডাকে ‘চেঙে’। বইপত্রে, লেখালেখিতে, মানচিত্রে আমরা এতদিন চেঙ্গী নামে জানতাম। এখন চেঙ্গী থেকে বিকৃত হয়ে চিংড়ী বা চিংড়ি নামে নামকরণ আমাকে আহত করে।

এই নদীতে এক সময় বড় বড় মাছ ধরা পড়ত, যা এখন অতীত। মাছ না থাক, শুস্ক মৌসুমে পানি শুকিয়ে একেবারে নদীর তলানি পর্যন্ত জেগে ওঠে। ছেলেবেলায় মহালছড়ি থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পথে গুগড়াঘাটে শুস্ক মৌসুমেও নৌকায় পার হতাম। মহালছড়ি থেকে মাইসছড়ি পর্যন্ত লঞ্চ চলত। এ সব এখন ইতিহাস। বর্ষা মৌসুম ছাড়া চেঙ্গী নদীতে ছোট নৌকাও আর চলে না।

শুধু পানি কমে যায়নি, নদীর দুই ধারে বিভিন্ন জায়গায় অপরিকল্পিত বসতি বসেছে। সারা জেলার বর্জ্য, পলিব্যাগ আমাদের এই চেঙ্গীতে এসে জমা হচ্ছে। বর্ষায়, বন্যায় জমা ময়লা-আবর্জনা সব চেঙ্গী থেকে বিভিন্ন ছড়ার মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামেও ঢুকে পড়ছে। বর্তমানে বর্ষায় কাপ্তাই লেকের পানি ভরে উঠলেই কেবল চেঙ্গীর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।

নদী দূষণ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয় সত্য, কিন্তু বাস্তবে নদী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ আমরা খুব কমই দেখতে পাই। কাপ্তাই লেক, চেঙ্গী নদীকে ঘিরে নানা স্থানে পর্যটন স্পট, নতুন করে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ, আগ্রহ দেখা যায়, শোনা যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদকে প্রাকৃতিকভাবে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা, নদীকে নদীর মতোই করে রাখার ভাবনার অভাব সর্বত্র। লেকের পাড়ে যেখানে সেখানে ঘরবাড়ি, বর্জ্য নিক্ষেপ চলে প্রশাসনের সামনে (দেখুন: ঞ্যোহ্লা মং, ‘ডাস্টবিনবিহীন এক শহর!’ দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬)।

বিলাইছড়ি উপজেলার রাইংক্ষ্যং নদীকেও ‘রাংখাইন’, ‘রাংখিয়াং’ নামে লেখা শুরু হয়েছে। নদীটিকে তংচংগ্যা ভাষাভাষিরা বলে রাইনছ্যং, চাকমা ভাষাভাষিরা রেইংখ্যং আর পাংখোয়ারা বলে রেংখ্যং নামে। রাইক্ষ্যং নদী হিসেবে অভিহিত হয়ে থাকলেও বর্তমানে নানা নামে বিকৃত হয়ে পাহাড়ে খিয়াং আর সমতলে রাখাইন জনগোষ্ঠীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা হচ্ছে।
আমাদের নদীগুলো দূষিত হতে হতে অবশিষ্ট কিছু নেই। এখন নদীর নামেও দূষণ শুরু হয়েছে। এই দূষণ বন্ধ হওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, চেঙ্গী নদীতে লবণাক্ত চিংড়ি মাছ পাওয়া যায় না। হয়ও না। এখানে পাওয়া যায় ছোট ছোট প্রজাতির ইচা মাছ। ছড়াগুলোতে পাওয়া যায় ছড়ার ইচা। খুলনার চিংড়ি এখানে হয় না, পাওয়াও যায় না।

আমাদের চেঙ্গী নদীকে স্থানীয়রা ‘চইংগী’ বা ‘চেঙে’ নামেই ডাকে। শুধু লেখার সময় লেখে চেঙ্গী। প্রাকৃতিক উৎসগুলোর নাম একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই, যুক্তিনির্ভর লম্বা সময় নিয়ে, গ্রহণযোগ্য নাম ধারণ করে। সে নামগুলোকে অযত্ন, অবহেলা করা উচিত নয়। গবেষক, লেখকদের নাম দূষণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। নামের দূষণ হলে আমাদের চেঙ্গীর অস্তিত্বই হারিয়ে যাবে। চেঙ্গী নদীর মাঝেই আছে আমার সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস। চেঙ্গীর সঙ্গে আমার জীবনের গল্প জড়িত। আমার চেঙ্গী, আমাদের চেঙ্গী, চিংড়ী হতে পারে না, যায়ও না।

”বাংলাদেশে বর্তমানে সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম তাজিনডং (তজিংডং)। এটি বান্দরবান জেলায় অবস্থিত। তাজিনডং একটি মারমা ভাষার শব্দ। এর বাংলা করলে হয় ‘গহীন অরণ্যের পাহাড়’। কিন্তু এ শব্দটি তৎকালীন সরকার পরিবর্তন করে রাখেন ‘বিজয়’। আমার খুব খারাপ লেগেছিল বলে এ নিয়েও লিখেছিলাম। আমি মনে করি আমার এই ভাষা তাজিনডং পরিবর্তন করে বিজয় রাখা মানে, আমার ভাষাকে, আমার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। আমি চাইবো, আমার ভাষায় তাজিনডংকে, আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক”।

আমাদের চেঙ্গী নদী সরকারিভাবে পরিবর্তন হয়েছে বলে জানা যায় না। এটি গবেষক, লেখকদের আবিস্কৃত বলে মনে করি। আমি আবার আমার প্রথম লেখা প্রবন্ধের সুরে দাবি জানাতে চাই, আমার এই চেঙ্গী, চেঙ্গী নামেই থাকুক। আমরা এই নামেই ডাকতে, শুনতে, কথা বলতে, লিখতে চাই। অন্য কোনো নামে নয়। আমাদের চেঙ্গী, আমাদের ভালোবাসা। আমাদের আবেগ ও আমাদের গল্প। নদী, পাহাড়, প্রাকৃতিক উৎসগুলোর নাম বিকৃত করা, পরিবর্তন করাও পবিবেশ দূষণ হিসেবে চিহ্নিত হোক। (সুত্র-সমকাল)