প্রাচীন নিদর্শন মনোমুগ্ধকর ‘হাতি বাংলো’

দূর থেকে দেখলে মনে হবে পাহাড় চূড়ায় শুঁড় তুলে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক হাতি। তবে কাছে গেলেই ভ্রম ভাঙে। দেখতে হাতির মতো হলেও সেটি নিষ্প্রাণ, ইট-পাথরের তৈরি একটি ডুপ্লেক্স বাংলো। হাতির অবয়বে নির্মাণ করায় এই বাংলোর নামও ‘হাতি বাংলো’। এই নিষ্প্র্রাণ ‘হাতিই’ মানুষের প্রাণ জুড়িয়ে চলেছে।

চট্টগ্রাম নগরীর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত অসাধারণ সুন্দর একটি জায়গা হলো সিআরবি। এই জায়গাটিকে আরও সুন্দর, আরও মনোমুগ্ধকর করেছে হাতির বাংলোটি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যারা সিআরবিতে ঘুরতে আসেন, তাদের আনন্দ দেয় এই বাংলো। সিআরবিতে রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি। বাংলোটি ঘিরে থাকা পাহাড় চূূড়ার বৃক্ষরাজি থেকে ভেসে আসা পাখির কলতানও আগন্তুকদের মুগ্ধ করে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মালিকানাধীন স্থাপনাটিতে হাতির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে ছাই রঙের প্রলেপ। এ কারণে নতুন আগন্তুকরা প্রথমে বাংলোটিকে দূর থেকে দেখে জীবন্ত হাতি ভেবে চমকে ওঠেন। কাছে গিয়ে আরও বিস্মিত হন।
এর দু’পাশে দুটি করে চারটি জানালা রয়েছে। সামনে ও পেছনে তিনটি করে রয়েছে ছয়টি জানালা। সামনে শুঁড়ের অবয়বের দিকে একটি করে দুটি গোলাকার জানালা রয়েছে। এগুলো দেখতে হাতির দাঁতের মতোই। শুঁড়ের সামান্য উপরের দিকে রয়েছে গোলাকার দুটি ছিদ্র। এগুলো দেখতে হাতির চোখের মতো। লম্বা করে বানানো শুঁড়ের নিচে রয়েছে বাংলোর ব্যালকনি। পেছনেও রয়েছে হাতির লেজের আকৃতি। দু’পাশের অংশেও হাতির মতো ঢাউস পেট শোভা পাচ্ছে।

বাংলোটির বয়স জানলে হতবাক হতে হয়। ১৮৯৩ সালে সিআরবির পাহাড় চূড়ায় বাংলোটি নির্মাণ করা হয়। এ হিসাবে বর্তমানে এর বয়স ১২৮ বছর! এরপরও বেশ শক্তপোক্ত স্থাপনাটি। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুরোটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ অংশেই জমে গেছে শ্যাওলা। সবমিলিয়ে ধ্বংস হতে চলেছে সিআরবির ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম একটি স্মারক স্থাপনা।

রেলওয়ের সংশ্নিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, হাতির বাংলোটি নির্মাণ করা হয়েছে ‘ফেরো সিমেন্ট’ দিয়ে। ফেরো সিমেন্ট হচ্ছে এক ধরনের সিমেন্ট ও কংক্রিটের মিশ্রণ। স্থাপনা নির্মাণে যাতে ‘তার জালি’ ব্যবহূত হয়। ১৯৪০ সালে পিএল নেরভি নামে ইতালির এক স্থপতি ফেরো সিমেন্ট আবিস্কার করেন। ফলে শত বছর পার হলেও এখনও মজবুত তারজালি ও বালুর সঙ্গে এক ধরনের সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হাতির বাংলোটি।

সিআরবির যে পাহাড়টিতে হাতির বাংলো রয়েছে, সেখানে যাওয়ার রাস্তাটির অবস্থা খুবই নাজুক। এই পথে যে গেটটি রয়েছে সেটিও তালাবদ্ধ থাকে সব সময়। ফলে আগন্তুকদের হাতির বাংলোতে যেতে হয় লেডিস ক্লাবের সামনের রাস্তা দিয়ে নতুুবা লালখান বাজার-সংলগ্ন নার্সারিঘেঁষে যাওয়া রাস্তা দিয়ে। মূল পথ এড়িয়ে বিকল্প পথ দিয়ে যেতে আগন্তুকদের নানামুখী সমস্যায় পড়তে হয়। অনেকে না চেনার কারণে এই বাংলো না দেখেই ফিরে যান।
রেলওয়ের বাংলোর দায়িত্বে আছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সহকারী মহাব্যবস্থাপক জোবেদা আক্তার। তিনি সমকালকে বলেন, রেলের হাতির বাংলোয় অতিথি রাখার মতো অবস্থা না থাকায় অনেক দিন ধরে এখানে কোনো অতিথি রাখা হয় না। তবে এটি যেহেতু ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ, তাই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। এ জন্য আমরা উদ্যোগও নিচ্ছি।