ফেসবুকের কালো তালিকায় বাংলাদেশের এক ব্যক্তি ও ৬ জঙ্গি সংগঠন

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২১

সারা বিশ্বের চার হাজারের বেশি ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সংগঠনকে কালো তালিকাভুক্ত করে রেখেছে ফেসবুক। ‘বিপজ্জনক’ বিবেচনায় বেশ কয়েক বছর আগেই গোপনে এই কালো তালিকা তৈরি করে ফেসবুক। ঘৃণা, গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়াতে ফেসবুকের ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি এই গোপন কালিকা প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশের ৬ জঙ্গিবাদী সংগঠন ও একজন ব্যক্তিও রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্টারসেপ্টে ১২ অক্টোবর এ সম্পর্কিত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ফেসবুকের কাছ থেকে পাওয়া তালিকাটি তারা কিছু সম্পাদনাসহ প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তি ও সংগঠনের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়, সন্ত্রাসবাদীদের বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রমে ফেসবুক একটি সহায়ক মাধ্যম হয়ে উঠেছে বলে সম্প্রতি বিস্তর সমালোচনার মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বহু বছর ধরেই তারা সহিংসতা উসকে দিতে পারে বিবেচনায় বহু ব্যবহারকারীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে।

ইন্টারসেপ্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘ ও মার্কিন কংগ্রেসের অনলাইনে জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোর সদস্য সংগ্রহ নিয়ে সতর্কতা জারির প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালেই ফেসবুক নিজেদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডে কিছু সংযোজন ঘটায়। সেখানে ‘সন্ত্রাসবাদী বা সহিংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছে এমন কোনো রেকর্ড থাকলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে’ নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়। এই নীতিই পরে আরও বিস্তৃত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়ক কোনো নীতি রয়েছে এমন সংগঠন ও ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফেসবুকের ৩০০ কোটি ব্যবহারকারীর জন্য এমন নীতি তেমন উৎসাহব্যঞ্জক নয় যদিও।

এই নীতির আলোকেই তৈরি হয়েছে ফেসবুকের কালো তালিকাটি, যেখানে রয়েছে বাংলাদেশের ছয় সংগঠনও। সংগঠনগুলো হলো—আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যুক্ত আল মুরসালাত মিডিয়া অ্যান্ড ইসলামিক স্টেট বাংলাদেশ, আল-কায়েদা কেন্দ্রীয় কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলা হরকাতুল-জিহাদ ইসলামি বাংলাদেশ ও আনসারুল্লাহ বাংলা, জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং জেএমবির সঙ্গে যুক্ত সংগঠন সাহাম আল হিন্দ মিডিয়া। এ ছাড়া আরেকজন ব্যক্তির নামও রয়েছে সে তালিকায়। তিনি হলেন তরিকুল ইসলাম, জেএমবির সঙ্গে যুক্ত।

এই তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে শুধু নয়, এদের নিয়ে কোনো পোস্ট দেওয়া থেকেও ফেসবুক তার ব্যবহারকারীদের বিরত রাখছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ ধরনের কোনো তালিকা ফেসবুকের রয়েছে কিনা, থাকলে তা প্রকাশের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির ওপর চাপ দিয়ে আসছিলেন অধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা। তাঁদের মূল দাবি ছিল, বিপজ্জনক বিবেচনায় ফেসবুক যদি কাউকে কালো তালিকাভুক্ত করে, তবে সেই তালিকা প্রকাশ করা হোক। কিন্তু এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কিছুই বলছিল না।

এখন ফেসবুকের বিরুদ্ধে ঘৃণা, গুজব ইত্যাদি ছড়ানোর যে অভিযোগ উঠেছে এবং সময়ের সঙ্গে দিন দিন তা বাড়ছে, তার প্রেক্ষাপটেই প্রতিষ্ঠানটি তার এমন তালিকা নিয়ে মুখ খুলল। এই কালো তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন, যার মধ্যে রাজনীতিক, লেখক, দাতব্য সংস্থা, হাসপাতাল, গান, এমনকি বহু বছর আগেই মারা যাওয়া ঐতিহাসিক ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

দ্য ইন্টারসেপ্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশ আগে চালু হলেও সম্প্রতি এই তালিকায় যুক্ত হওয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুব দ্রুত বেড়েছে। এ থেকে বাদ যাননি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একরকম একচ্ছত্র হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে শুরু করে মার্কিন ক্যাপিটল হিলের দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত সবাইকেই এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি ঘৃণা ও গুজব ছড়ানোয় ফেসবুকের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে। সেখানে বলা হয়, ফেসবুক বাস্তব জীবনে অনেক নেতিবাচক ঘটনার সঙ্গে প্রভাবক হিসেবে জড়িয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ফেসবুকের এক ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে পাওয়া একটি নথি প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। সেখানে জানানো হয়, এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটির পরিশ্রমের প্রমাণ হিসেবে গোপন এই নীতির কথাই তুলে ধরেছেন ফেসবুকের এই ভাইস প্রেসিডেন্ট।

তবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে ফেসবুকের এমন নীতির সমালোচনাও আছে ব্যাপকভাবে। বলা হচ্ছে, এই অজুহাতে ফেসবুক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্বের যে চর্চা করছে, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনো জবাবদিহি করছে না। এতে বিশেষ কিছু সম্প্রদায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

বহু বছর ধরেই আইনজ্ঞ ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই তালিকা ও সংশ্লিষ্ট নীতিটি প্রকাশের জন্য ফেসবুককে আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু ফেসবুক বলছে, এটি তারা করতে চায় না। কারণ, এতে ফেসবুকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বা অনুরূপ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি নিজেদের নীতি কিছুটা এদিক-ওদিক করে একই কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। যদিও ইন্টারসেপ্টকে নিজেদের কর্মীর ওপর এখন পর্যন্ত কোনো হুমকি এসেছে কিনা, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি ফেসবুক।