পাহাড়-প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যময় গাবরাখালী

প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২১

সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের উঁচু নীল তুরা পাহাড় থেকে পাখিদের সঙ্গে উড়ে আসে সাদা সাদা মেঘ। এপারে ছোট বড় পাহাড়গুলোর গাছে গাছে কাঠ বিড়ালীর ছোটাছুটি, অনেক সময় গাছের উঁচু ডালে দৃষ্টি আটকে যাবে, দেখা মিলবে লজ্জাবতী বানর। পাহাড়ের মাঝে মনোরম লেক দেখে হয়তো দুপুরের রোদে ঘামে ভেজা শরীরকে শীতল করতে মন চাইবে।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার গাবরাখালী গারো পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য এভাবেই আকৃষ্ট করে সবাইকে। তাইতো প্রকৃতির টানে শহরের কোলাহল ছেড়ে মানুষ ছুটে আসে গাবরাখালী পাহাড়ের সৌন্দর্যে হারিয়ে যেতে।

গাবরাখালী গ্রামে একসময় হাজং ও বানাই জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। সিমান্তঘেঁষা এই গ্রামটির উত্তর প্রান্ত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমানা। ১২৫ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছোট-বড় ১৬৭টি টিলা রয়েছে। যার কোনটি প্রায় ৭০ ফুট আবার কোনটি ২০০ ফুট উঁচু। এই টিলাগুলো আবার স্থানীয়দের কাছে নানা নামে পরিচিত। কোনটি চিতাখলা টিলা, যশুর টিলা, মিতালি টিলা, বাতাসি টিলাসহ বাহারি নাম রয়েছে। এই টিলার ওপর দাঁড়িয়ে সীমান্তের ওপারে মেঘালয় রাজ্যের মানুষের জীবন ও জীবিকার দৃশ্য খুব কাছ থেকে দেখা যায়। সন্ধ্যায় ভারতের সীমানার দিকে নীলাভ আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে খুবই সুন্দর।

হালুয়াঘাট পৌরশহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মেঘালয় রাজ্যের সিমান্তঘেঁষা গাবরাখালী পাহাড়। ময়মনসিংহ জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম গাবরাখালীতে পর্যটন কেন্দ্র করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পাহাড়-টিলা জরিপপূর্বক এ এলাকায় পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও বিকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করা শুরু হলেও কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে তা কিছুটা বিলম্বিত হয়। তবে ২০২০ সালের মাঝামাঝি এসে এটি গতি পায়, যা বর্তমানে একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলার লাখ লাখ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এটি অনন্য ভূমিকা রাখবে এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। করোনা মহামারীর কারণে বিধিনিষেধ সত্ত্বেও এই ঈদ ও ঈদের পরের দুই দিনে এই পর্যটন কেন্দ্রে প্রায় ১১ হাজার দর্শনার্থী ঘুরে গেছেন বলে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

সরকারিভাবে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নে ২০১৯-২০ অর্থবছরে হালুয়াঘাট উপজেলা পরিষদ থেকে ১ কোটি টাকার উপর বরাদ্দ দিয়েছে। সেই বরাদ্দ থেকেই পর্যটন কেন্দ্রটির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। পরে জেলা প্রশাসন থেকেও পর্যটনকেন্দ্রটির বিকাশে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে যা দৃশ্যমান পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে।

পর্যটন কেন্দ্রকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য প্রবেশ মুখেই রয়েছে সুউচ্চ পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলের মনোরম ঝর্ণধারা। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া লেকে রয়েছে ঝুলন্ত ব্রিজ, লেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য প্যাডেল বোটের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। লেকজুড়েই দেখা মিলবে দেশীয় হাঁসের কোলাহল। এই লেকেই স্থানীয় এলাকাবাসীর আয় বাড়ানোর জন্য মৎস্য চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে মনোরম রেস্ট হাউস। এ ছাড়াও বিশ্রামের জন্য গারো ভাষায় জারামবং (পূর্ণিমা) ও ফ্রিংতাল (শুকতারা) নামে দুটি বিশ্রামাগার রয়েছে।

পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পাহাড়ে রোপণ করা হয়েছে কাজুবাদাম, আগর (সুগন্ধি), চা, কফি গাছ। পাহাড়ের টিলায় উঠার জন্য করা হয়েছে স্টিলের সিঁড়ি, গাড়ি রাখার জন্য রয়েছে গাড়ি পার্কিং জোন। পাহাড়ের কিনার বেয়ে ভারত থেকে বয়ে আসা ছোট ঝর্ণা ধারায় রাবার ড্যাম দিয়ে পানি সংরক্ষণ করে বোরো মৌসুমে সেচ দেওয়া হয়। টিলায় বসবাসরত স্যাটেলারদের জন্য উপজেলা প্রশাসন আশ্রয়ণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সমবায়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার জন্যও গৃহীত হচ্ছে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড, পাশাপাশি স্থানীয় বেকার যুবকদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই পর্যটন কেন্দ্রটি ঘিরে বিভিন্ন দোকানের পশরা সাজিয়ে বসেছেন স্থানীয়রা।

দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে এখানে প্রধান ফটক, সুইমিং পুল, ওয়াচ টাওয়ার, শিশু পার্ক, তথ্য কেন্দ্র, মিনি চিড়িয়াখানা ইত্যাদির কাজ চলমান রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, পর্যটন কন্দ্রটির কাজ শেষ হলে এই উপজেলার লাখ লাখ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এটি অনন্য ভূমিকা রাখবে।

(কালের কণ্ঠ)