কোভিডের সঙ্গে বেড়েছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের উৎপাত

প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২১

বৈশ্বিক মহামারী করোনা সমগ্র পৃথিবীর মানবজাতিকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে। প্রতিদিনই বহু প্রাণ ঝরছে। কোভিডের তান্ডবে সারা পৃথিবীতে নানা ধরনের সংকট চলছে। মানবসভ্যতা স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি। কোভিডের আঘাতে প্রতিনিয়ত সমগ্র পৃথিবী জর্জরিত। করোনার মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের (মিউকরমাইকোসিস) সংক্রমণ। ভারতের দিল্লিতে ইতিমধ্যেই একে মহামারি ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশেও সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে করোনায় সংক্রমিত রোগীদের মধ্যে এর সংক্রমণ বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। এর অন্যতম একটি কারণ রোগীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া। মিউকর নামের একধরনের ছত্রাকের কারণে এই রোগ হয়। সাধারণত আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় এর বংশবিস্তার বেশি হয়। সাধারণত শ্বাসের সময়ে বা শরীরে কাটাছেঁড়া অংশের মাধ্যমে এটি মানবদেহে প্রবেশ করে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কমে গেলে এটা রোগ হিসেবে দেখা দেয়। এটি একটি ছত্রাক-জনিত রোগ। মিউকোরমাইকোসিস খুবই বিরল একটা সংক্রমণ। সাধারণত মিউকোর ছত্রাক পাওয়া যায় মাটি, গাছপালা, সার এবং পচন ধরা ফল ও শাকসবজিতে।

চিকিৎসকরা বলছেন, এই ছত্রাক মাটি এবং বাতাসে এমনিতেই বিদ্যমান থাকে। এমনকি নাক ও সুস্থ মানুষের শ্লেষ্মার মধ্যেও এটা স্বাভাবিক সময়ে থাকতে পারে। এই ছত্রাক সাইনাস, মস্তিষ্ক এবং ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের ফুসফুস যেহেতু দুর্বল থাকে, সেজন্য তাদের ক্ষেত্রে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে সংক্রমিত রোগীদের সাধারণত যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তার মধ্যে রয়েছে: নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নাক থেকে রক্ত পড়া। চোখে ব্যথা এবং চোখ ফুলে যাওয়া। চোখের পাতা ঝুলে পড়া। চোখে ঝাপসা দেখা, যার থেকে পরে দৃষ্টিশক্তি চলে যায়। নাকের চামড়াার চারপাশে কালো ছোপ ছোপ দাগ দেখা দেয়া। এটি একটি বিরল সংক্রমণ।

বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, করোনা অতিমারি ছড়ানোর আগে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ দেখা যেত এক লাখ মানুষের মধ্যে একজনের শরীরে। এই রোগে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশের কাছাকাছি বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। বিভিন্ন ধরনের রোগীর মধ্যে এই সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। সঙ্কট বাড়ছে বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে। ক্যানসার আক্রান্তরাও সমস্যায় পড়ছেন। মূলত যে সব রোগ শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, কোনও কোভিড সংক্রমিতের তেমন কিছু আগে থেকে থাকলে অবস্থার অবনতির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। ফলে গোটা দেশেই চিকিৎসকেরা আর্জি জানাচ্ছেন রক্তে শর্করার মাত্রা কম রাখতে। এই ছত্রাক করোনা রোগীদের মধ্যেই শুধু ছড়ায়, এমন নয়। কোনও মানুষের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এই সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল ভারতে । এই ফাঙ্গাসের সংক্রমণ বাড়ছে সমগ্র ভারতে।

প্রথমে মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, তেলেঙ্গানায় বেশি দেখা দিয়েছিল এই সংক্রমণ। ঘটেছে কয়েক হাজার মৃত্যু। পশ্চিমবঙ্গেও এ সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনার কথা জানা গিয়েছিল। আমাদের দেশেও এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া রোগীদের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও বিশ্বের কয়েকটি জায়গায় এর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। কোভিড থেকে সেরে ওঠার সময়ে বেশ কিছু রোগীকে নতুনভাবে সংক্রমিত হতে দেখা গিয়েছে এই ছত্রাকে। এই ছত্রাক করোনা রোগীদের মধ্যেই শুধু ছড়ায়, এমন নয়। কোনও মানুষের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এই সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। করোনায় প্রতিরোধ শক্তি কমে যাচ্ছে। এর ফলে এমন রোগীদের শরীরে বেশি দেখা দিচ্ছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস।

করোনা রোগীর চিকিৎসায় স্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে অনেক সময়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। তার জেরে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সেই রোগীর শরীরে বাসা বাধার সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে করোনা রোগী যখন বেশ খানিকটা সেরে উঠছেন, সে সময়ে নতুন এই সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। তাই করোনা-চিকিৎসায় স্টেরয়েড কম ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ সবচেয়ে ক্ষতিকর। যথেষ্ট তাড়াতাড়ি এই সংক্রমণ ধরা না পড়লে চিকিৎসা চালানো কঠিন। কারণ, এমন রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণ খুব দ্রুত বৃক্কে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।

ডায়াবেটিস ছাড়াও যে সব কোভিড আক্রান্তের ক্যানসার, বৃক্কের রোগ কিংবা যকৃতে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের সাবধান থাকতে হবে। শুধু করোনা চিকিৎসা চলার সময় নয়, সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও। কারণ, করোনা থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসার পরেও বহু সময়ে নতুন করে দেখা দিচ্ছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে কোনও নাক-কান-গলার চিকিৎসকের পরামর্শও নেওয়া যায়। তা ছাড়া, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দেখে নিতে হবে। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে সংক্রমিত হচ্ছে সেটির পরিসংখ্যান রাখা দরকার। সংক্রমণের সম্ভাবনা কমিয়ে আনা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বা সিডিসি বলছে, যেসব জায়গায় অনেক বেশি ধুলোবালি রয়েছে সেসব জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। যদি সেসব জায়গা এড়িয়ে চলা সম্ভব না হয়, তাহলে এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেসব স্থাপনা পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সেগুলোর সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। সিডিসি বলছে এসব জায়গা থেকে ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে।

শরীরের চামড়ায় যাতে কোন ইনফেকশন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। কোথাও কেটে গেলে কিংবা চামড়া উঠে গেলে সেটি যাতে ধুলো-ময়লার সংস্পর্শে না আসে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা রোগীর স্টেরয়েড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে। স্টেরয়েড ব্যবহারের ফলে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে সংক্রমতি হবার ঝুঁকি বেশি ধাকে। রোগীকে অক্সিজেন দেবার সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। মাস্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বলছে, এসব সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নিলেই যে মিউকোরমাইকোসিস সংক্রমণ এড়ানো যাবে সেটি এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। রোগটি ছোঁয়াচে নয়। তবে সংক্রমণ নাক, চোখ, কখনো কখনো মস্তিষ্কেও ছড়ায়। যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে তাঁদের শরীরে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস প্রবেশ করলে ফুসফুস ও সাইনাস আক্রান্ত হতে পারে। পরে শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ে। করোনায় সংক্রমিত সংকটাপন্ন রোগীদের জীবন বাঁচাতে ফুসফুসের প্রদাহ কমাতে স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা অনেক বেড়ে যায় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রস্রাবে সংক্রমণ, ক্যানডিডিয়াসিস, দাঁতে বা কানে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ অনেকেরই হচ্ছে। করোনা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। করোনা–পরবর্তী জটিলতা হিসেবে নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। কাজেই করোনার জটিলতা কমাতে হলে করোনার ঝুঁকিই কমাতে হবে আগে। ধুলাবালু ও স্যাঁতসেঁতে জায়গা এড়িয়ে চলা। ডায়াবেটিস থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। জ্বর বা করোনা পজিটিভ হলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন না করা। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার, ভিটামিন এ, বি, সি, ডি, ই –সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। তবে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নতুন কিছু নয়। এ রোগ আগেও ছিল। এ নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সুস্থ ব্যক্তিদের শরীরে এ সংক্রমণের আশঙ্কা নেই বললেই চলে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস আমাদের পরিবেশে সব সময়ই থাকে। এমনকি মানুষের শরীরেও থাকে। আমাদের সকলের সতর্কতা ও সাবধানতাই কেবল এসকল রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায়।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়