ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেহাল দশা

প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২১

নানা সমস্যায় জর্জরিত ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই চলছে ৫০ শয্যার চিকিৎসাসেবা। রংচং করে হাসপাতাল ভবন চাকচিক্য করা হলেও এক যুগ ধরে অকেজো এক্স-রে মেশিন। সেটিকে এখন ওষুধ রাখার তাক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন ও ডেন্টাল চেয়ার। মাঝেমধ্যেই নষ্ট হয়ে যায় সরকারি অ্যাম্বুল্যান্স। কোনো রকম জোড়াতালি দিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাসপাতালে আসা শত শত রোগী যথাযথ চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকায় বাধ্য হয়েই তাদের অতিরিক্ত টাকা খরচ করে প্রাইভেট ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে এক্স-রে করানোসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

জানা যায়, উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ২০১০ সালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু ৫০ শয্যার জনবল এখনো পদায়ন করা হয়নি। ফলে ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই দীর্ঘদিন ধরে চলছে এর কার্যক্রম। ২০০৯ সাল থেকে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে হাসপাতালের এক্স-রে মেশিন। এটি চালু করার জন্য অনেকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিলেও কোনো কাজ হয়নি। দীর্ঘ এক বছর ধরে অকেজো ইসিজি ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন। এতে গর্ভবতী নারী, হার্ট ও পেটের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা চরম বিপাকে পড়ছে। অতিরিক্ত টাকা খরচ করে হাসপাতালের বাইরে থেকে তাদের এক্স-রে, ইসিজি ও আলট্রাসনোগ্রাম করাতে হচ্ছে। দন্ত চিকিৎসক না থাকায় নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ডেন্টাল চেয়ার। দুই বছর আগে এ হাসপাতালে এক দন্ত চিকিৎসককে পোস্টিং দেওয়া হয়। তত দিনে ডেন্টাল চেয়ারসহ অন্যান্য সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে দন্ত চিকিৎসক থাকলেও চেয়ার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সচল না থাকায় সঠিক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট রোগীরা। প্রায় চলাচলের অনুপযোগী সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সটি। সপ্তাহের বেশির ভাগ সময়ই অচল হয়ে পড়ে থাকে। স্থানীয় মেকারের মাধ্যমে ঠিকঠাক করে জোড়াতালি দিয়ে মাঝেমধ্যে চালানো হয় এটি।

এদিকে হাসপাতালে প্রায় পাঁচ বছর ধরে সিজার কার্যক্রম বন্ধ আছে। ফলে এলাকার গর্ভবতী নারীদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। রোগীদের বিভিন্ন ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিতে এক ডজনেরও বেশি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে হাসপাতাল চত্বরে। রোগী এলেই পিছু ছোটে তারা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এক্স-রে করাসহ সব ধরনের সুযোগ কম খরচে করে দেওয়ার কথা বলে হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা রয়েছে এসব দালালচক্রের মধ্যে। তা ছাড়া বিভিন্ন ওষুধ কম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধিরা রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলা নিয়েও ব্যস্ত থাকেন। এতে অনেকের ব্যক্তিগত সমস্যার কথাও জেনে যান তাঁরা। এ নিয়ে বিব্রত হয় অনেক রোগী। তবে রক্ত ও মলমূত্র পরীক্ষার কার্যক্রম স্বাভাবিক আছে; কিন্তু অনেকেই বিষয়টি জানে না। এ কারণে হাসপাতালে রক্ত ও মলমূত্রের পরীক্ষাও হয় সীমিত। অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত কিংবা কাটাছেঁড়া করা প্রয়োজন—এমন রোগী জরুরি বিভাগে এলে উেকাচ ছাড়া সেবা পায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা না দিলে জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ডবয়রা এসব রোগীর শরীরে হাত দিতে চান না। তবে ৫০-১০০ টাকা দিলে সেবা দেন ঠিকই।

পীরগঞ্জ পাঠচক্রের সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, পীরগঞ্জ হাসপাতালে কোনো চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সব ধরণের যন্ত্রপাতি নষ্ট। এখন করোনার ভয়ে চিকিৎসকরাও ঠিকমতো হাসপাতালে আসছেন না।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আব্দুল জব্বার বলেন, ‘অচল এক্স-রে মেশিনসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বহুবার জানানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা হয়নি। তবে করোনাকালীন হাসপাতালের চিকিৎসকরা সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের গাফিলতি করা হচ্ছে না। আর হাসপাতাল চত্বরে কোনো দালালকেই প্রশ্রয় দেওয়া হয় না।’