৫০০ টাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, মানছে না অনেক প্রতিষ্ঠান

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২১

দেশের বেশিরভাগ স্থানে এখন সরকার নির্ধারিত একই রেটে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ৫০০ টাকায় ৫ এমবিপিএস প্যাকেজ রয়েছে বেশিরভাগ অঞ্চলভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের। তবে জাতীয়ভাবে বড় পরিসরে সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার নির্ধারিত এই মূল্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে না। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বনিম্ন প্যাকেজের মূল্য ১ হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি। আবার কিছু ছোট প্রতিষ্ঠানেরও ৫০০ টাকার প্যাকেজ নেই। তবে পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানকেই সরকার নির্ধারিত একই রেটে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দিতে হবে। থাকতে হবে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকার প্যাকেজও। নতুবা ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি, ‘এক দেশ, এক রেট’ স্লোগানে সরকার সারাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের একই দাম নির্ধারণ করেছে। দেশে প্রথমবারের মতো গত ৬ জুন ৫ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা, ১০ এমবিপিএস ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা ও ২০ এমবিপিএস-এর দাম ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে এরসঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। আর সেদিন থেকেই সারাদেশে এক রেটে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সরবরাহ শুরু হয় বলে সরকারের ভাষ্য। কিন্তু তখন আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) ও এনটিটিএন (ভূগর্ভস্থ ক্যাবল সেবা) সেবার মূল্য নির্ধারণ করে না দেওয়ায় ‘এক রেট’ বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছিল। চলতি আগস্ট মাসে তাও নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। ফলে, সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে এক রেট পুরোদমে কার্যকর হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সরকারের ঘোষণার পর ছোট ছোট বেশিরভাগ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের প্যাকেজেও পরিবর্তন এনেছে। পূর্বে একই প্যাকেজের মূল্য বেশি থাকলেও তা কমিয়েছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। আবার আগে থেকেই ৫০০ টাকায় ৫ এমবিপিএস ব্যান্ডইউথ সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে ব্যান্ডইউথ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যান্য প্যাকেজেও সরকার নির্ধারিত রেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা হয়েছে। তবে কিছু ছোট ও বেশিরভাগ বড় প্রতিষ্ঠান এখনও সরকার নির্ধারিত রেট বাস্তবায়ন করেনি।

দেশের বৃহৎ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লিংক থ্রি, ট্রাইএঙ্গেল, আম্বার আইটি, আমরা নেটওয়ার্কস ও বিডিকম নামের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ৫০০ টাকায় কোনো প্যাকেজই দিচ্ছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের সর্বনিম্ন প্যাকেজের মূল্য ১ হাজার কিংবা তারও বেশি। লিংক থ্রির সর্বনিন্ম ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্যাকেজ ৯৯৯ টাকা। তারা এই টাকায় ১২ এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির কল সেন্টার থেকে জানানো হয়, নতুন গ্রাহকদের জন্য তাদের এই প্যাকেজ। তবে বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে তাদের ৫০০ টাকার প্যাকেজ রয়েছে। একই অবস্থা ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ট্রাইএঙ্গেল এর।

প্রতিষ্ঠানটির কাস্টমার কেয়ার থেকে জানানো হয়, তাদের সর্বনিম্ন প্যাকেজ ১২৯৯ টাকার। সমপরিমাণ টাকায় তারা ২৫ এমবিপিএস ব্যান্ডইউথ দিচ্ছে। সর্বনিম্ন ৫০০ টাকায় ৫ এমবিপিএস প্যাকেজের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকার বা আইএসপিএবি’র পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তারা কোনো লিখিত আদেশ পায়নি। পেলে সে অনুযায়ী নতুন প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে। আরেক বড় প্রতিষ্ঠান আম্বার আইটিরও একই অবস্থা। প্রতিষ্ঠানটির সর্বনিম্ন প্যাকেজ ১৫ এমবিপিএস ১ হাজার টাকা। এর নিচে কোনো প্যাকেজ নেই বলে জানানো হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কাস্টমার কেয়ার থেকে।

বিডিকম নামের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটির সর্বনিম্ন প্যাকেজ ৯৪৫ টাকা। তারা এই টাকায় ১৫ এমবিপিএস ব্যান্ডইউথ দিচ্ছে। ৫০০ টাকায় ৫ এমবিপিএসর প্যাকেজ নেই তাদের। বড় আরেক প্রতিষ্ঠান আমার নেটওয়ার্ক মূলত করপোরেট অফিসে ব্যান্ডইউথ সরবরাহ করে থাকে। তবে তাদের আবাসিক প্যাকেজেরও সর্বনিম্ন দাম ১৬০০ টাকা। সমপরিমাণ অর্থে তারা ২৫ এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করে।

তবে কার্নিভাল ইন্টারনেট নামের বড় আরেক প্রতিষ্ঠান সরকার নির্ধারিত দামে প্যাকেজ দিচ্ছে। পূর্বে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ডোজ। প্রতিষ্ঠানিট ৫ এমবিপিএস ৫০০ টাকায়, ১০ এমবিপিএস ৮০০ টাকায় ও ২০ এমবিপিএস ১২০০ টাকায় দিচ্ছে। স্মাইল ব্রডব্যান্ডও মেনে চলছে সরকারের নির্দেশনা। তাদের ৫ এমবিপিএস প্যাকেজের মূল্য ৫০০ টাকা। এদিকে রাজধানীর মহাখালী, মিরপুর ও কাফরুল এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সরবরাহ করে ‘ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

কথা হলে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার জুয়েল বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের সর্বনিম্ন প্যাকেজ ৬ এমবিপিএস। মাসিক চার্জ রাখা হচ্ছে ৫০০ টাকা। আগে ৫ এমবিপিএস ৫০০ টাকা রাখা হতো। সরকার ৫ এমবিপিএস ৫০০ টাকা করায় আমরা ৫০০ টাকায় ৬ এমবিপিএস করেছি। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে আমরা কম দাম রাখছি। আমাদের ৮ এমবিপিএস ৬০০ টাকা ও ১০ এমবিপিএস ৭০০ টাকা রাখছি।’

রাজধানীর শাহীনবাগ এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে ঢাকা নেট নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির টেকনিশিয়ান মেহেদি হাসান জানান, তাদের সর্বনিম্ন প্যাকেজ ৫ এমবিপিএস ৫০০ টাকা। সব সময় একই গতি থাকে। আর ২০ এমবিপিএস ১ হাজার ৫০০ টাকা। তারা সরকার নির্ধারিত রেট বাস্তবায়ন করছে।

এদিকে সেগুনবাগিচা, নয়া পল্টন, গুলিস্থান ও মগবাজার এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে ‘মাইক্রোলিংক টেকনোলজি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

এই প্রতিষ্ঠানটির কাস্টমার কেয়ার থেকে জানানো হয়, আগে তারা ৩ এমবিপিএস এর দাম ৫০০ টাকা রাখলে বর্তমানে তারা ৫ এমবিপিএস ৫০০ টাকায় দিচ্ছে। সরকার দাম নির্ধারণ করে দেওয়ায় তারাও নতুন করে প্যাকেজের দাম র্নিধারণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য তারা সরকার নির্ধারিত রেট বাস্তবায়ন করেছে।

কাফরুল এলাকায় ইন্টারনেট সেবা দেওয়া ব্রডব্যান্ট ইন্টারনেট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবুজ বলেন, ‘আমাদের সর্বনিম্ন প্যাকেজ ৪০০ টাকা। ৪ এমবিপিএস ৪০০ টাকায় দিচ্ছি। কারও কারও বাচ্চাদের ক্লাস করানোর জন্য ইন্টারনেট প্রয়োজন। হয়ত টাকা নেই। তাদের জন্য আমাদের এই প্যাকেজ। এ ছাড়া ৫ এমবিপিএস ৫০০ টাকায় দিচ্ছি। অন্যান্য প্যাকেজ তো আছেই।’

তবে সব প্রতিষ্ঠানই সর্বনিম্ন ৫০০ টাকার প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে না। এমনই একটি কোম্পানির নাম টেট্রাসফট। প্রতিষ্ঠানটি রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট ও শাহীনবাগ এলাকায় ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মিলন বলেন, ‘আমাদের সর্বনিম্ন প্যাকেজ ৬০০ টাকা। রাতে ৫ এমবিপিএস ও দিনে ১৫ এমবিপিএস ব্যান্ডইউথ দিয়ে থাকি আমরা। একই অবস্থা নাখালপাড়ার হাজী অনলাইন নামের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের। তাদেরও সর্বনিম্ন প্যাকেজ ৬০০ টাকা।’

ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সংগঠন আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত এক রেট বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। ৫০০ টাকায় ১: ৮, যারা নিচ্ছে আমরা তাদের দিচ্ছি। তবে বেশিরভাগ গ্রাহক এতে সন্তুষ্ট নয়। তাদের ব্যান্ডউইথের চাহিদা আরও অনেক বেশি। অনেকে ডেডিকেটেড ব্যান্ডউইথ চায়। করপোরেট অফিস শেয়ার ইন্টারনেট দিয়ে চলে না। তাদের ক্ষেত্রে মাসিক চার্জও বেশি।

তিনি বলেন, ‘ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ৫২৫ টাকার যে প্যাকেজ বেশিরভাগ ব্যান্ডউইথ ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তা নিশ্চিত করেছে। যারা বেশি টাকা নিচ্ছে অনেকের হয়তো লাইসেন্স নেই। শহর অঞ্চলে এটি হচ্ছে না। গ্রামে হয়তো ইন্টারনেটের মাসিক চার্জ বেশি। কারণ সেখানে হয়তো একচেটিয়া ব্যবসা হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, ‘যারা সরকার নির্ধারিত রেট বা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আমরা জানিয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে হয়তো সরকার ব্যবস্থ নেবে।’

৫০০ টাকায় বড় বড় প্রতিষ্ঠানটিগুলোর প্যাকেজ না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘দুই তিনটি কোম্পানি সরকারের নির্দশনা মেনে চলছে না। তাদের ব্যাপারে আমরাও জেনেছি। সেপ্টেম্বর থেকে ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সরকার নির্ধারিত তিনটি প্যাকেজই বাস্তবায়ন করতে হবে।’

বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার বলেন, ‘কোন প্রতিষ্ঠান যদি নির্দেশনা না মানে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওইসব প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হবে। ১ লা সেপ্টেম্বর থেকে ট্যারিফ বাস্তবায়ন হবে। সেদিন থেকে সবাইকে মানতে হবে। এ বিষয়ে যদি কোনো ভোক্তার অভিযোগ থাকে, লিখিত আকারে তা জমা দেয়, তবে ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে সরকার নির্ধারিত ট্যারিফ বলবৎ হবে। আমরা অপেক্ষা করছিলাম, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে এরইমধ্যে আমাদের আলাপ আলোচনা শেষ হয়েছে। আশা করি সেপ্টেম্বর থেকে সবাই সরকার নির্ধারিত প্যাকেজ বাস্তবায়ন করবে। সর্বনিম্ন ৫০০ টাকায় ৫ এমবিপিএসের প্যাকেজ যেমন থাকতে হবে, তেমনি বাকি দুটি প্যাকেজও রাখতে হবে। বড় কোম্পানিগুলো তা না মানলে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। বড় কোম্পানি বলে আমরা ছাড় দেব, এমনটি ভাবার কিছু নেই। পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে বিটিআরসি অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।’