দেশীয় উদ্ভাবন: তরুণদের তৈরি সাশ্রয়ী মূল্যের ভেন্টিলেটর

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২১

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারি ছড়িয়ে পরার পর যে যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে, সেটি হচ্ছে মেডিকেল ভেন্টিলেটর।

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের মতো বাংলাদেশেরও প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে দুষ্প্রাপ্য এই জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রের অভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীরা শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন এবং মারা যান।

কিন্তু এই যন্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় চাইলেই সব হাসপাতালে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তবে মহামারির এই সময়ে বাংলাদেশের প্রযুক্তি উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাক্স’ (CRUX) এর গবেষকরা দেশে প্রথমবারের মতো তৈরি করেছেন একটি উন্নত প্রযুক্তির মেডিকেল ভেন্টিলেটর। যা স্বল্প খরচে সহজেই তৈরি করা যাবে এবং একই সঙ্গে এটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং সহজে বহনযোগ্য।

এই প্রযুক্তি উদ্যোগের গবেষকরা তাদের উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহারের জন্য না রেখে এটি নির্মাণের প্রযুক্তি ও গবেষণা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন সারা বিশ্বের জন্য। যা দেশের জন্য সম্মানও নিয়ে এসেছে ইতোমধ্যে।

তাদের এই গবেষণা পত্রটি আগামী ১২ থেকে ১৫ নভেম্বর জাপানের কিয়োটোতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বায়োমেডিকেল এবং বায়োইনফরম্যাটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য গৃহীত হয়েছে গত ৯ আগস্ট।

এর পরদিন ১০ আগস্ট এই ভেন্টিলেটর বাংলাদেশের প্রথম ওপেন সোর্স হার্ডওয়্যার হিসেবে ওপেন সোর্স হার্ডওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন (ওএসএইচডব্লিউএ) এর প্রত্যয়ন পায়। এর আগে বাংলাদেশের অসংখ্য সফটওয়্যার ওপেন সোর্স প্রত্যয়ন পেলেও এটিই প্রথম কোনো ওপেন সোর্স হার্ডওয়্যার, যা আন্তর্জাতিক এই সংস্থার মাধ্যমে প্রত্যয়িত হয়েছে।

গত বছরের মার্চে দেশে করোনাভাইরাস মহামারি আঘাত হানার প্রায় মাসখানেক পরে ক্রাক্সয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ রাজওয়ানুল হক নাবিল তার দলের সদস্য একেএম মারুফ হোসেন রাহাতকে সঙ্গে নিয়ে একটি ভেন্টিলেটর প্রকল্প শুরু করেছিলেন।

ভেন্টিলেটর নির্মাণের দলে পরে যুক্ত হয়েছেন শোভন সুদান সাহা, মো. হাসানুর রহমান সোহাগ, ফজলে রাব্বি শাফি এবং সত্য রঞ্জন সরকার। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে গত বছরের জুলাইয়ে ভেন্টিলেটরের প্রথম প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়।

ক্রাক্স এর প্রতিষ্ঠাতা নাবিল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও দেশের প্রথম ড্রোন প্রকল্পের টিম লিডার হিসেবে পরিচিত।

ভেন্টিলেটর প্রসঙ্গে নাবিল বলেন, ‘দ্রুত উৎপাদনযোগ্য, স্বল্প খরচ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পোর্টেবল টারবাইনভিত্তিক ভেন্টিলেটরটি অন্য যেকোনো বাণিজ্যিক ভেন্টিলেটরের মতোই দক্ষতার সঙ্গে কার্যকর।’

তিনি বলেন, ‘এর শব্দের মাত্রা অন্য ভেন্টিলেটরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক এবং এটি পিআরভিসি, পিসিবি, এসআইএমভি এবং বাইপেপ মোডে কার্যকরী। আমরা সোলেনয়েড এবং পিপ ভালবের পরিবর্তে একটি প্রেশার রিলিজ মেকানিজম তৈরি করছি, যা ৩৫ শতাংশ কম শক্তি খরচ করে এবং অত্যন্ত সাশ্রয়ী। এটি যে কোনো ধরণের পেশেন্ট সার্কিটের সঙ্গে কার্যকরী। ভেন্টিলেটরে রিয়েলটাইম ডেটা প্রদর্শনের জন্য একটি বড় স্ক্রিনও সংযুক্ত করা হয়েছে।’

নাবিল বলেন, ‘একটি বাণিজ্যিকভাবে নির্মিত ভেন্টিলেটরের বর্তমান বাজার দর প্রায় ১০ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকার মধ্যে। কিন্তু এই ওপেন সোর্স ভেন্টিলেটরটি উৎপাদনে সকল আনুষঙ্গিক খরচসহ মাত্র ১ থেকে ২ লাখ টাকা ব্যয় হবে।’

নাবিল আরও বলেন, ‘এই ভেন্টিলেটরটি একটি মডুলার ডিজাইন হওয়ায় কেবল ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হওয়া অংশটি প্রতিস্থাপন করেই এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে।’

ক্রাক্সয়ের নির্মিত ভেন্টিলেটরটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানাস্থেসিওলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. সব্যসাচী রায় বলেন, ‘একজন পেশাদার হিসেবে আমি তাদের নির্মিত ভেন্টিলেটর পরীক্ষা করেছি এবং এটি যে কোনো সাধারণ বা কোভিড-১৯ রোগীর জন্য বাজারে পাওয়া যেকোনো আইসিইউ ভেন্টিলেটরের মতোই দক্ষভাবে কাজ করে।’

তিনি জানান, ভেন্টিলেটরটির বাণিজ্যিক উৎপাদন ও আইসিইউতে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।

তিনি বলেন, ‘যদি কোনো কোম্পানি উৎসাহী হয়ে এই ভেন্টিলেটরটির বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য এগিয়ে আসে, তাহলে তা রোগীদের জীবন রক্ষায় খুবই উপকারী হবে।’

বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. তানজিলুর রহমান বলেন, ‘মহামারির সময় ভেন্টিলেটর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি জীবন রক্ষাকারী যন্ত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। যেহেতু তারা (ক্রাক্স) বাংলাদেশে এটি নিয়ে গবেষণা ও নির্মাণ করেছে এবং এটিকে ওপেন সোর্স বানিয়েছে, এটি দেশের যে কেউ বা বিশ্বের যে কোনো দেশে সহজে প্রাপ্ত প্রযুক্তির সাহায্যে উৎপাদন করা যাবে।’

বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক মুনির বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রযুক্তিবিদরা বছরের পর বছর ধরে মুক্ত উৎস সফটওয়্যার তৈরিতে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। বিগত কয়েক দশক ধরে, আমরা সফটওয়্যারকেন্দ্রিক ছিলাম। কিন্তু ক্রাক্স বিশ্বকে দেখিয়েছে যে বাংলাদেশ হার্ডওয়্যারের ক্ষেত্রেও অবদান রাখতে শুরু করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এটি তরুণদের উৎসাহিত করবে এবং এই উদ্যোগ বাংলাদেশকে একটি হার্ডওয়্যার উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে সাহায্য করবে।’

ক্রাক্সয়ের উদ্যোক্তা ও গবেষকরাও দেশের প্রথম মুক্ত উৎস হার্ডওয়্যারের স্বীকৃতি এবং কিয়োটোতে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণা পত্র উপস্থাপনের বিষয়টি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরছে বলে বিশ্বাস করেন।

নাবিল বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রচেষ্টা, মূল্যবান সময় এবং যোগ্যতায় এই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রের নির্মাণ করেছি এবং এই প্রযুক্তি উন্মুক্ত করে দিয়েছি। যাতে করে যে কেউ জীবন রক্ষাকারী এই মেডিকেল ভেন্টিলেটর তৈরি করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি যদিও বাংলাদেশের জন্য গর্বের, কিন্তু প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহী মনোভাবের কারণে আমরা শুরু থেকেই আর্থিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কাজ করেছে। তবে এ সময় অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীও পেয়েছি, যারা আমাদেরকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন।’

এই তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা আরও বলেন, ‘মুক্ত উৎস প্রকল্পও বাণিজ্যিকভাবে টেকসই হতে পারে। মুক্ত উৎস রেখেও আমাদের বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিটি সবার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবুও, একটি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ও গবেষক হিসেবে এই ভেন্টিলেটর নির্মাণ করে আমরা যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছি, তাতে আমরা খুশি। এই আনন্দ আরও বিস্তৃত হবে যখন এই ভেন্টিলেটরটি সত্যিকার অর্থেই মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে ব্যবহৃত হবে।’ সুত্র : দ্য ডেইলি স্টার