গর্বের স্টেশনগুলোর অবস্থা আজ জরা-জীর্ণ

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২১

১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মধ্যে প্রথম কুষ্টিয়া জগতি রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন থেমেছিল। ভগ্নস্তূপে পরিণত হওয়া ঐতিহ্যবাহী স্টেশনটি বাঁচিয়ে রাখতে কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই। এক সময় হয়তো স্টেশনটির নাম ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে। তবে বাস্তবে সেটির কোনো চিহ্ন থাকবে না। দেশের প্রথম রেলস্টেশন জগতিতে এখন দিন-দুপুরে ভূতুড়ে পরিবেশ।

কুষ্টিয়া পৌর শহরের আড়াই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জগতি রেলওয়ে স্টেশন। এ স্টেশন দিয়ে রাজবাড়ী, দর্শনা, কুষ্টিয়া, গোপালগঞ্জ ও রাজশাহীর মধ্যে ট্রেন চলাচল করলেও এখানে কোনো ট্রেন বিরতি দেয় না। প্রায় চার যুগ ধরে স্টেশনটি বন্ধ। অসাধারণ কারুকাজ ও নকশা তৈরি ঐতিহ্যবাহী স্টেশনটি দিন দিন জীর্ণ হয়ে পড়ছে। স্টেশন ঘিরে থাকা রেলওয়ের জমি দিন দিন বেদখলে চলে যাচ্ছে। চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা এসব জমি দখল করে নানা স্থাপনা গড়ে তুলছে। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্য-চলমান রেলপথ নিত্যদিন দেখভাল করার কথা থাকলেও তা করা হয় না। সেখানে বন্ধ থাকা রেলওয়ে স্টেশনগুলো রক্ষণাবেক্ষণের চিন্তা করার সুযোগ নেই।

জগতিসহ দেশের ঐতিহ্যবাহী স্টেশনগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। এগুলো আবার চালু করারও কোনো উদ্যোগ নেই। যুগের পর যুগ বন্ধ থাকায় স্টেশনগুলো ঘিরে ট্রেনের গতিও কমছে। শুধু জগতি স্টেশন নয়, এমন আরও ১১৪টি স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ স্টেশনগুলোর অধিকাংশই ব্রিটিশ আমলে তৈরি।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত স্টেশনগুলো বন্ধ রয়েছে। চা শিল্প এলাকায় থাকা স্টেশনগুলো স্বাধীনতার পর থেকে বন্ধ হতে থাকে। প্রকল্পের পর প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় না। ২০০৯ সালের পর কয়েকটি স্টেশন চালু করা হলেও লোকবলের অভাবে সেগুলোও ধুঁকছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, দিন দিন স্টেশন মাস্টার এবং পয়েন্টসম্যান অবসরে যাচ্ছেন। কিন্তু শূন্যপদ পূরণ করা হচ্ছে না। আবার লোকবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও রেলে ‘কালো বিড়াল’খ্যাত দুর্নীতির কারণে বেশ কয়েকবার নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বঞ্চিতরা একের পর এক মামলা করছেন।

রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, বিএনপি-জাতীয় পার্টির সরকার স্টেশনগুলো একের পর এক বন্ধ করে দিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে আমরা রেলে পরিবর্তন শুরু করেছি। ইতোমধ্যে বন্ধ ৬৭টি রেলওয়ে স্টেশন চালু করেছি। বাকি স্টেশনগুলোও চালু করতে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। এজন্য সম্প্রতি ২৩৫ জন স্টেশন মাস্টার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। স্টেশন মাস্টার নিয়োগ হলে বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো আবার চালু করা হবে।

তিনি আরও বলেন, বন্ধ স্টেশন এলাকায় ট্রেন নির্ধারিত গতি নিয়ে চালানো সম্ভব হয় না। কম গতি নিয়ে স্টেশন এলাকা অতিক্রম করতে হয়। চালু থাকলে গতি কমানোর প্রয়োজন হয় না। আমরা নতুন লাইন ও স্টেশন নির্মাণ করেছি। চলমান ৪৩টি উন্নয়ন প্রকল্প সমাপ্ত হলে রেলে আমূল পরিবর্তন আসবে।

রেলওয়ে অপারেশন ও ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, স্টেশন মাস্টার নিয়োগে সম্প্রতি যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তা সম্পূর্ণ ও নির্ধারিত সময় পর্যন্ত প্রশিক্ষণ শেষ হতে প্রায় আড়াই বছর সময় লাগবে। এ সময়ের মধ্যে আবার প্রায় সমপরিমাণ স্টেশন মাস্টার অবসরে চলে যাবেন। ফলে সামনের দিনগুলোতে আরও স্টেশন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চুক্তিভিত্তিক স্টেশন মাস্টার ও ট্রেনচালক রয়েছেন। অভিযোগ-চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে অবৈধ অর্থের লেনদেন থাকায় পদগুলোতে লোকবল নিয়োগে আগ্রহ দেখান না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শুধু বন্ধ থাকা ১১৫টি স্টেশন চালু করতে ৩৫১ জন স্টেশন মাস্টার ও সহকারী স্টেশন মাস্টার প্রয়োজন। রেলওয়ে আইন অনুযায়ী একজন স্টেশন মাস্টারকে দুই বছরের বেশি প্রশিক্ষণ নিতে হয়। প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ হলেই শুধু তাকে স্টেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ৪৩টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৭২টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগেরই ২৭টি স্টেশন বন্ধ। এসব স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেই। যদিও বলা হচ্ছে-স্টেশন মাস্টার নিয়োগ শেষে এসব স্টেশন চালু করা হবে। কিন্তু এর আগে জীর্ণ স্টেশনগুলো মেরামত কিংবা বর্ধিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। প্রায় প্রতিটি স্টেশনে ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। স্টেশনগুলো ‘বি’ শ্রেণির। এগুলো ট্রেনের গতি বাড়াতে সহায়ক। অর্থাৎ ‘বি’ শ্রেণির স্টেশন এলাকায় বাধাহীন গতি তোলা ও দ্রুত সময়ে ক্রসিং নিশ্চিত করা গেলে ট্রেনের কাক্সিক্ষত গতি তোলা সম্ভব।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে অনেক বন্ধ স্টেশন চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, বন্ধ স্টেশন এলাকায় গতি নিয়ে ট্রেন চালানো সম্ভব নয়। তাই লোকবল নিয়োগ শেষে আমরা আরও স্টেশন চালু করব। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান পরিবহণ কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, বন্ধ থাকা স্টেশনের জন্য ট্রেনের প্রকৃত গতি উঠানো যায় না। এছাড়া খুব সাবধানে ট্রেন চালাতে হয়। স্টেশনগুলো চালু হলে রানিং টাইম কমে আসবে। একই সঙ্গে স্টেশনগুলোও রক্ষা হবে। আমরা চাই, ঐতিহ্যবাহী স্টেশনগুলো যথাযথ মেরামত করে আবার চালু হোক। তিনি আরও বলেন, নতুন লাইন ঘিরে প্রায় ২০টি নতুন স্টেশন তৈরি করা হয়েছে।

গাইবান্ধার ভরতখালী রেলওয়ে স্টেশন প্রায় ২২ বছর ধরে বন্ধ। এ এলাকার সাধারণ ট্রেন যাত্রীদের দুর্ভোগ দেখছে না কেউ। সিলেট লাইনের ফেঞ্চুগঞ্জ ও মোগলাবাজার স্টেশন যুগের পর যুগ বন্ধ। কৃষি ও চা শ্রমিকরা এসব স্টেশন ব্যবহার করতেন। নতুন রেলওয়ে স্টেশনও ৬ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব-জামালপুর রেলপথে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর রেলওয়ে স্টেশনটি ২০১১ সালে নির্মাণ করা হয়। ২০১২ সালের ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্টেশনটি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর ৩ বছর চালু থাকলেও প্রায় ৬ বছর ধরে বন্ধ। সুত্র : যুগান্তর