স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই সাগরপথে বাড়ছে মাছ আমদানি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২১

দেশে সাগরপথে মাছ আমদানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে এসব মাছ। যদিও এক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকছে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি। শুধু ফরমালিন পরীক্ষায় ছাড়পত্র পাওয়া আমদানীকৃত মাছে ক্ষতিকর বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হওয়া মাছের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে সাগরপথে আমদানি হয়েছে ৬৫ হাজার ৩৮৮ টন হিমায়িত মাছ। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৬৫৭ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে সাগরপথে আমদানীকৃত মাছের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে তিন বছরের তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণে আমদানি হার দ্বিগুণেরও বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৪৪৩ টন আমদানি হওয়া মাছের শুল্কায়ন করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সাগরপথে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসছে সি ক্যাট ফিশ (মাগুর, শিংসহ অন্যান্য), রূপচাঁদা, সেড বা গিজার্ড সেড, সার্ডিন প্রভৃতি। এসব সামুদ্রিক মাছ আমদানি হচ্ছে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওমান, ইয়েমেন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এছাড়া কাতার, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম থেকেও মাছ আমদানি করা হচ্ছে।

সাগরপথে আমদানি হওয়া হিমায়িত মাছে ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে কিনা তা খালাসের আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায়িত্ব কাস্টমস কর্তৃপক্ষের। সংস্থাটি শুধু ফরমালিন আছে কিনা তা পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে তাদের কার্যক্রম। আমদানি নীতিতে মাছের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ না থাকা ও আমদানি করা মাছে ফরমালিন ছাড়া অন্যান্য পরীক্ষা করার বিধান না থাকার কথা জানান কাস্টমস কর্মকর্তারা। অথচ সামুদ্রিক মাছ আমদানিতে শুধু ফরমালিন পরীক্ষায় আর্সেনিক, পারদ, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু শনাক্ত হয় না।

চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মো. ফখরুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হওয়ার আগে আমরা মাছের ফরমালিন পরীক্ষা করছি। এর বাইরে অন্য কোনো ধরনের পরীক্ষা হয় না।

আর্সেনিক, পারদ, সিসা ও ক্যাডমিয়াম পরীক্ষার শর্ত আরোপ চেয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন। চিঠিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সাগর থেকে তেল উত্তোলনের জন্য স্থাপন করা রিগের কারণে তেল মিশ্রিত পানিতে মাছ মরে ভেসে ওঠে বলে তথ্য দেয়া হয়। ফলে এসব দেশ থেকে আমদানি হওয়া সামুদ্রিক মাছ মাইক্রোবায়োলজি পরীক্ষা ছাড়াও মার্কারি পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে।

বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নূরুল কাইয়ুম খান জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত মাছের বহু কনটেইনার একের পর এক ধরা পড়েছিল। তখন সাময়িক পদক্ষেপও নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন আর কোনো উদ্যোগ নেই। নামমাত্র যে পরীক্ষার কথা বলা হচ্ছে, তাতে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনায় থাকছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশ থেকে খাওয়ার অযোগ্য মাছ দেশে আমদানি হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে মানবদেহের ক্ষতিকর পদার্থ ক্যাডমিয়ামও পাওয়া গেছে। তদারকি না থাকার সুযোগ নিয়েই এসব মাছ আমদানি হচ্ছে।

চট্টগ্রামে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক (সামুদ্রিক) ড. মো. শরীফ উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, সাগরপথে আমদানি হওয়া এসব মাছ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। আমদানিকারকরা বিভিন্ন দেশ থেকে অত্যন্ত কম দামে খাওয়ার অনুপযুক্ত ও নিম্নমানের মাছ নিয়ে আসছেন। এমনকি পোলট্রি শিল্পের উপকরণ হিসেবে আনা মাছও মানুষের খাদ্য হিসেবে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে বাজারে। আমদানীকৃত নিম্নমানের মাছ চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটসহ পাইকারি বাজারগুলোতে স্বল্পমূল্যে বিক্রি হওয়ায় আকৃষ্ট হচ্ছে ক্রেতারা। অথচ চাহিদা বিবেচনায় আমাদের সামুদ্রিক মাছের আহরণ উদ্বৃত্ত থাকছে। বছরে এখন গড়ে সাড়ে ছয় লাখ টনেরও বেশি সামুদ্রিক মাছ পাচ্ছি আমরা।’

ফিশারিঘাটে মাছ কিনতে আসা খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে আমদানি করা মাছের প্রতি আগ্রহ বেশি। কারণ দেশী যে সামুদ্রিক মাছ ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেই একই আকারের মাছ ফিশারিঘাটে ১০০ টাকার কমে পাওয়া যায়।

আমদানি করা মাছের মাধ্যমে ক্ষতিকর বিভিন্ন রাসায়নিক মানবদেহে প্রবেশ করছে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হওয়া মাছের গুণগত মানের বিষয়টি নিশ্চিত না করার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সুশান্ত বড়ুয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমদানি হওয়া মাছের শুধু ফরমালিন পরীক্ষা দিয়ে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিশ্চিত হয় না। ফরমালিন পরীক্ষায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর আর্সেনিক, পারদ, সিসা, ক্যাডমিয়াম শনাক্তের সুযোগ নেই। ভারী ধাতুসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক মানবদেহে ক্যান্সারসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, শুধু সামুদ্রিক মাছই নয়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন প্রথম সারিতে থাকলেও ভারত ও মিয়ানমার থেকে কার্পজাতীয় মাছ প্রচুর আমদানি হচ্ছে। এর মধ্যে বেশি রুই-কাতলা। যদিও দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে যত মাছ উৎপাদন হয়, তার মধ্যে অন্যতম রুই। এর পরই সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে কাতলা।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা মাছ পরীক্ষা করে বিষাক্ত উপাদান নিশ্চিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা সব মাছ বাধ্যতামূলক পরীক্ষার নির্দেশনা দেয়। সে সময় বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবে ভারী ধাতুর পরীক্ষা শুরু হয়। এ প্রক্রিয়ায় বন্দর দিয়ে আসা একের পর এক চালানে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি ধরা পড়তে থাকে। যদিও দুই বছর আগে এ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে নেয়া হয়।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, আমদানীকৃত সব মাছে অতিমাত্রায় ভারী ধাতু, বিশেষ করে সিসা, ক্রোমিয়াম ও মার্কারি পাওয়া যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দেশকে খাদ্যে ভেজালমুক্ত করা বা নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার গুরুত্বারোপ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছিল। তখন উদ্যোগ নিয়ে আমদানি হওয়া মাছের চালানের নমুনা রেডিয়েশন পরীক্ষার জন্য পরমাণু শক্তি কমিশনের পরমাণু শক্তি কেন্দ্রে এবং ফরমালিন পরীক্ষার জন্য মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ে পাঠানো হতো। এ দুই পরীক্ষায় শুধু ফরমালিন ও তেজস্ক্রিয়তা সহনীয় মাত্রায় আছে কিনা তা নির্ণয় করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। আমদানীকৃত মাছের নমুনায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষার ব্যবস্থাটি বন্ধ হয়ে যায় বন্দর থেকে পণ্য চালান খালাস নিতে জটিলতা হওয়ার কারণ দেখিয়ে। সুত্র: বণিকবার্তা