২০৫০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা; বিলীন হতে পারে সুন্দরীগাছ

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। সাগরের পানির লবণাক্ততা সহিষ্ণু গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ এই বনের সামনে এখন অতিরিক্ত লবণাক্ততাই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এ বনে অব্যাহতভাবে বাড়ছে লবণাক্ততা। বনের ভেতরে জমছে পলিও। এ অবস্থা চললে ২০৫০ সালের মধ্যে সুন্দরবনের পরিবেশে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে; বিলীন হতে পারে সুন্দরীগাছ।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার সরকারের নেতৃত্বে চলেছে গবেষণাটি। তার সহযোগী ছিলেন যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জেসন ম্যাথিউপউলস ও ড. রিচার্ড রিভ।

২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণার ফল গত ১০ এপ্রিল ইকোলজিক্যাল সোসাইটি অফ আমেরিকা প্রকাশিত ইকোলজিক্যাল মনোগ্রাফস জার্নালে প্রকাশ হয়।

‘সলভিং দ্য ফোর্থ-কর্নার প্রবলেম: ফোরকাস্টিং ইকোসিস্টেম প্রাইমারি প্রোডাকশন ফ্রম স্পেশিয়াল মাল্টিস্পেসিস ট্রেইট-বেজড মডেলস’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়, সুন্দরবনের লবণাক্ততা ও পলি জমার পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় ৫০ শতাংশ বাড়লে বনের কার্যক্ষমতা ২৯ শতাংশ কমে যাবে।

এতে গাছের গড় উচ্চতা প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে যেতে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়বে সুন্দরবনের প্রধান সুন্দরীগাছ। অতিরিক্ত লবণ ও পলির কারণে সুন্দরীগাছের উচ্চতা ও পাতায় খাদ্য উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমবে।

এর পাশাপাশি অন্যান্য লবণসহিষ্ণু ছোট গাছ (যেমন: গেওয়া, গরান) সুন্দরীগাছের জায়গা দখল করে নেবে। ফলে সুন্দরবনের ভারত অংশের মতো বাংলাদেশ অংশেও বিলীন হয়ে যেতে পারে সবচেয়ে বেশি কার্বন ধারণক্ষমতার সুন্দরীগাছ।

বাংলাদেশ ও ভারতের অংশে থাকা সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে বনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এই বনকে ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো।

অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত চার দশকে সুন্দরবনের লবণাক্ততা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। আর প্রতি বছর সুন্দরবনে ৯৬ হাজার টন পলি জমছে।’

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বাড়ছে এবং পলি জমছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে মিঠা পানির অসম বণ্টনের ফলেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।’

সংকট কাটাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির হার সীমিত রাখার ওপর জোর দেন এ গবেষক। একই সঙ্গে তিনি নদীশাসন করে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানির সুষম বণ্টনের তাগিদ দেন।

নিজেদের গবেষণা সম্পর্কে অধ্যাপক স্বপন কুমার বলেন, ‘বন বিভাগের উদ্যোগে সুন্দরবনের ভেতরে ১৯৮৬ সালে ১২০টি স্থায়ী স্যাম্পল প্লট স্থাপন করা হয়। আমরা ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এসব প্লট থেকে ২০ প্রজাতির ৪৯ হাজার ৪০৯টি উদ্ভিদের তথ্য সংগ্রহ করি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, পশুর, বাইন, সিংড়া ও কেওড়া। এই গাছগুলোর সঙ্গে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক কেমন বা গাছগুলো কীভাবে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ায়, তা নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে।’

তিনি জানান, গবেষণার সময় গাছের চারটি বৈশিষ্ট্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে গাছের উচ্চতা বৃদ্ধি ও সালোকসংশ্লেষণ ক্ষমতা থেকে জানা গেছে, গাছের বেড়ে ওঠা বা পরিবেশ থেকে পুষ্টি সংগ্রহের ক্ষমতার বিষয়টি। এর বাইরে কাঠের ঘনত্ব ও পাতার পানি ধারণক্ষমতা থেকে জানা যায়, গাছগুলো প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য কতটা সহন ক্ষমতাসম্পন্ন।

অধ্যাপক স্বপন কুমার জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বনের অবস্থা তুলনামূলকভাবে অন্য অংশের চেয়ে ভালো ও অপেক্ষাকৃত বেশি কার্যক্ষম।

তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দশকের ধারাবাহিকতায় যদি সুন্দরবনের মাটির লবণাক্ততা ও পলিস্তর বাড়তে থাকে, তাহলে ২০৫০ সাল নাগাদ এই বনের প্রতিবেশ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হবে। লবণাক্ততা ও পলি জমার পরিমাণ এই সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ বাড়লে সুন্দরবনের মোট কার্যক্ষমতা ২৯ শতাংশ কমে যাবে।’

গবেষণায় সুন্দরবনের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে লম্বা গাছ পাওয়া গেছে। লবণাক্ততা ও পলি বাড়লে এ গাছগুলো টিকে থাকার জন্য উচ্চতা কমিয়ে আনবে। এতে করে গাছের গড় উচ্চতা প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে যেতে পারে। এ সময়ে গাছগুলোর কাঠের ঘনত্ব এবং পাতার পানি ধারণক্ষমতার মাত্রা বেড়ে যাবে।

সুন্দরবনের গাছের প্রজাতিগুলোর মধ্যে সুন্দরীগাছ সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, ‘অন্যান্য গাছের তুলনায় সুন্দরীর লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা কম। ফলে এই প্রজাতি সবচেয়ে সংকটে পড়বে।’

অধ্যাপক স্বপন কুমার আরো বলেন, ‘গবেষণায় সম্পূর্ণ নতুন সমন্বিত বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। এতে সুন্দরবনের উদ্ভিদের সংখ্যা, অবস্থান ও শরীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের (যেমন: লবণাক্ততা, পলির মাত্রা, পুষ্টির উপাদান) সঙ্গে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, অভিযোজিত হয়, সেটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।’